
কলকাতা : এবার দিল্লিতে ভেঙে টুকরো টুকরো হতে চলেছে তৃণমূলের সংসদীয় দল। তবে প্রশ্ন হল – দিল্লিতে তৃণমূলের এই ভাঙন কোন মডেলে হবে? পশ্চিমবঙ্গের মতো ‘ঋতব্রত-মডেলে’? নাকি আম আদমি পার্টির মতো ‘রাঘব চাড্ডা’ মডেলে? তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা কি বিজেপিতে যোগ দেবেন ? নাকি নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ আখ্যা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে সরে যাবেন ?
তৃণমূল এখন ভেঙে খানখান। নকল বুঁদির গড়ে এখন কার্যত একা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভার রাশ হাতের বাইরে চলে গেছে। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের লেজিসলেটিভ পার্টি। আমরা চাই, মাননীয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে থাকুন।”
রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্য়ায় বলেন, “বলতে বাধ্য হচ্ছি প্রত্যেকটা যাঁরা তৃণমূল থেকে জিতেছেন, প্রত্যেকটা লুঠেরা রয়েছেন। তাঁরা চোর, ডাকাতি করেছেন। এখন নিজেদের সম্পত্তি, নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াই চলছে।”
এবার দিল্লিতে ভেঙে টুকরো টুকরো হতে চলেছে তৃণমূলের সংসদীয় দলও। সূত্রের খবর, ১৩ জন বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ ইতিমধ্য়ে বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সংখ্য়াটা বেড়ে ২০ জনও হতে পারে। এ প্রসঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “গত ৭ দিনে কোনও তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদের সঙ্গে কথা হয়নি। কিন্তু কাল সকালে হবে না এটা আমি বলছি না। যদি কাল পরশু কোনও সাংসদের সঙ্গে কথা হয় তাহলে বোঝার চেষ্টা করব যে দিল্লিতে কী হচ্ছে।”
এখন প্রশ্ন হল, দিল্লিতে তৃণমূলের এই ভাঙন কোন মডেলে হবে ? পশ্চিমবঙ্গের মতো ‘ঋতব্রত-মডেলে’? নাকি আম আদমি পার্টির মতো ‘রাঘব চাড্ডা’ মডেলে ?
এপ্রিলে বিজেপিতে যোগ দেন রাঘব চাড্ডা-সহ আম আদমি পার্টির ৭ জন রাজ্যসভার সাংসদ। রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টির সাংসদ সংখ্য়া ছিল ১০। তার মধ্য়ে ৭ জন দল ছাড়ায় দলত্যাগ বিরোধী আইন কার্যকর হয়নি। এরপর এই ৭জনই বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে রাজ্য়সভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন NDA-র সাংসদ সংখ্যা বেড়ে হয় ১৪৫। অর্থাৎ রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা ১৬৩-র আরও কাছাকাছি পৌঁছে যায় NDA শিবির। এখন প্রশ্ন হল, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা কি সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেবেন ? না কি ‘ঋতব্রত মডেলে’র মতো নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ আখ্য়া দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে সরে যাবেন ?
অধ্য়াপক শুভময় মৈত্র বলছেন, “এই মুহূর্তে বিজেপির খুবই প্রয়োজন যে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনওভাবে অর্জন করা। সেটা হলে কী হবে ? এক দেশ, এক ভোট এবং আমাদের প্রায় ৮০০-র ওপরে যে সংসদীয় আসন অর্থাৎ আমাদের সংসদের আকার বেড়ে যাওয়া, এই দুটি তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। আর একটি মডেল হতে পারে, তাঁদের মধ্যে ২০ জন একসঙ্গে বেরিয়ে গেলেন। গিয়ে, সরাসরি বিজেপিতে চলে গেলেন, যোগদান করলেন। আর একটি হতে পারে, ২০ জন ভেঙে আবার নতুন তৃণমূলের সঙ্গে, যেরকম ঋতব্রতবাবু করেছেন, সেটা করলেন এবং তাঁরা পরবর্তীকালে সংসদে বিজেপিকে সমর্থন করলেন। এই সম্ভাবনাটি অত্যন্ত বেশি যে তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার যারা সাংসদ আছেন, তাঁরা একটা বড় অংশ ভেঙে বেরোবেন।”
তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিলে কিংবা আলাদা হয়ে মহিলা সংরক্ষণ বিল কিংবা এক দেশ, এক ভোটের মতো নরেন্দ্র মোদির ড্রিম বিলের পক্ষে ভোট দিলে বিজেপির অনেকটাই সুবিধা হবে। অধ্যাপক প্রতীপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “ভাঙনটা সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু,যেটা ভাঙবে সেটা তৃণমূল নতুন একটা মডেল তৈরি করবে। সেইজন্য তারা ভাল তৃণমূল সেজে একটা আলাদা ব্লক করে, যেরকম বিধানসভায় করেছে…নামটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, কিন্তু কাজটা হচ্ছে বিরোধী। লোকসভায় কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সাংসদ আছেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে যিনিথেকে বেরিয়ে আসবেন, যেটা কাকলি ঘোষদস্তিদার হতে পারেন বা অন্যান্য কেউ হতে পারেন, সেটা কিন্তু অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। আমি মনে করছি, ভাঙবে, কিন্তু তাঁরা এখনই সরাসরি কোনও দলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন না।” তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙন নিশ্চিত। কিন্তু, কোন মডেলে ? সেটাই এখন দেখার।